সম্পাদকীয়
১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৭:৫৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ব্যাংক লুট, দ্বৈত নাগরিকত্ব ,রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইনী লড়াই

যারা নিজেরাই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফেরত না দিয়ে বিদেশে পাচার করেছে, আর এখন দেখা যাচ্ছে অনেকের দ্বৈত নাগরিকত্ব বা বিদেশে স্থায়ী স্বার্থ আছে, তাদের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা গেলে বাংলাদেশ যা পাবে তা হলো—
ব্যাংকিং খাতের আরও ধ্বংস
যারা নিজেরাই ঋণখেলাপি বা পাচারের সঙ্গে যুক্ত, তারা কখনোই
• কঠোর ব্যাংক সংস্কার
• ঋণখেলাপিদের শাস্তি
• স্বচ্ছতা বাস্তবায়ন করবে না।
কারণ করলে নিজেরাই ফাঁসবে।
রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত এটিএম বানানো
ক্ষমতা মানে তখন দেশ সেবা নয়, বরং
➝ শেষবারের মতো যতটা সম্ভব তুলে নেওয়া
➝ পরিবার ও গোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
➝ বিদেশের সম্পদ শক্ত করা
যাদের বিকল্প নাগরিকত্ব আছে তাদের নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব। ফলে সিদ্ধান্ত আসে জনগণের স্বার্থে নয়, নিজের এক্সিট প্ল্যান অনুযায়ী।
আইনের শাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে
যখন আইনপ্রণেতা, শাসক আর অপরাধী একই মানুষ হয়, তখন
➝ বিচার থাকে না
➝ তদন্ত থাকে না
➝ দায়বদ্ধতা থাকে  । সংক্ষেপে বললে:

ব্যাংক লুটেরা ও অর্থপাচারকারীদের হাতে ক্ষমতা দিলে বাংলাদেশ পায়—আরও লুট, আরও ঋণ, আরও অনিশ্চয়তা; আর তারা পায় নিরাপদ বিদেশি ভবিষ্যৎ।

সমাধান কোথায়?
• দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের জন্য উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে কঠোর নিষেধাজ্ঞা
• ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের আজীবন রাজনীতি নিষিদ্ধ করা
• স্বাধীন ব্যাংক কমিশন ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা
• নতুন, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গা তৈরি

এগুলো ছাড়া শুধু মুখ বদলালে বাস্তবতা বদলাবে না।

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের গভীরে রয়েছে একটি গুরুতর আইনি ও নৈতিক ব্যর্থতা—ব্যাংকিং খাতের লুটপাট এবং সেই লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার। এই সংকট কেবল অর্থনীতির নয়; এটি সংবিধান, আইনের শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতার প্রশ্ন।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ আত্মসাৎ, ঋণখেলাপিদের বারবার পুনঃতফসিল সুবিধা প্রদান এবং অর্থপাচারের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব প্রতিবেদন, আদালতের মামলার নথি এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে—এই অনিয়মের সঙ্গে রাজনীতির প্রভাবশালী অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এসব অর্থপাচারে অভিযুক্ত অনেক ব্যক্তির বিদেশে স্থায়ী সম্পদ ও দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। একইভাবে জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপি ও আর্থিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও নিষেধাজ্ঞার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব আইনি বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় আইন শিথিল করা হচ্ছে, যা আইনের শাসনের মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি এখানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। যদিও বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব সম্পূর্ণ অবৈধ নয়, তবে রাষ্ট্র পরিচালনার উচ্চপর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক স্বার্থসংঘাত (conflict of interest) তৈরি করে। যাদের পরিবার, সম্পদ ও নিরাপত্তা বিদেশে সুরক্ষিত, তাদের সিদ্ধান্ত জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। সংবিধানের ৫৬ ও ৬৫ অনুচ্ছেদের আলোকে এই প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আইনের শাসন তখনই কার্যকর থাকে, যখন আইনপ্রণেতা ও শাসক নিজেই আইনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু ব্যাংক লুট ও অর্থপাচারে জড়িত ব্যক্তিরা যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠে, তখন তদন্ত সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর ফল ভোগ করে সাধারণ নাগরিক—মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের ওপর আস্থাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের সামনে তাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারে জড়িতদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা, উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে দ্বৈত নাগরিকত্বের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ, এবং স্বাধীন ব্যাংকিং তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এগুলো বাস্তবায়ন ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল নাম বদলাবে; রাষ্ট্রের সংকট থেকে মুক্তি আসবে না।

 

সাব্বির আহামেদ মিয়াজী ,   এল.এলবি (লন্ডন ) এল.এলএম ।পিএইচডি (আইন বিষয়ে গবেষণা চলমান)

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্যাংক লুট, দ্বৈত নাগরিকত্ব ,রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইনী লড়াই

পাঁচ পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে জখম করে এবং হাতকড়াসহ আসামী ছিনতাই

মুগদা থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৩ জন গ্রেফতার

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

‘১০ হাজার কোটি টাকায়ও ডিসি সারওয়ারকে কেনা সম্ভব না’ #Sylhet #DCSarwar #News

শহীদ ওসমান হাদীর কবরে দোয়া ও ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের এমপি পদপ্রার্থী মিস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেঘনা আলম।

ঢাকা ৮ আসনের এমপি হয়ে, আমি মিডিয়া কর্মীদের সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও এই ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত নারী-পুরুষদের যে কোন বিপদ বা হয়রানিতে আইনি প্রতিকার পাবার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

❝দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ চেয়েছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।❞

“১০ হাজার কোটি টাকায়ও ডিসি সারওয়ারকে কেনা সম্ভব না’ -সারোয়ার ডিসি ,সিলেট ।

বাংলাদেশিদের জন্য আমেরিকার ভ্রমণ ও ব্যবসা ভিসায় নতুন কড়াকড়ি

১০

জকসুতে ২১ পদের ১৫টিতে শিবির, ৫ পদে ছাত্রদল আর একটিতে স্বতন্ত্রের জয়

১১

অবশ্যই আমি আমার পানির হিস্যা চাইঃ তারেক রহমান

১২

কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চশই উচ্চ বিদ্যালয়ের এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বৃত্তি প্রদান

১৩

ঠাকুরগাঁওয়ে যাচ্ছেন তারেক রহমান : ২৩ বছর পর

১৪

ঢাবির একাডেমিক কার্যক্রম ২ সপ্তাহ বন্ধ, হল ত্যাগের নির্দেশ

১৫

কুমিল্লা’য় শিক্ষার্থী হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল

১৬

৫ম ও ৮ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ২৮-৩১ ডিসেম্বর

১৭

কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে ৯টি’তে বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা

১৮

কুড়িগ্রামে একই আসনে লড়বে আপন দু’ভাই দুই দল থেকে

১৯

গুমের অভিযোগ নিয়ে ট্রাইব্যুনালে ছাত্রদল নেতা

২০